27

আধুনিক উত্তর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি তথা বিশ্বায়নের জীবনধারা অর্থনীতিনির্ভর। বিশ্বায়নের প্রভাবে প্রভাবিত জীবনধারা পূর্বের যে কোন সময়ের তুলানায় অধিক অর্থনীতি নির্ভর। মানব সমাজের অর্থনৈতিক চাহিদা জ্যামেতিক হারে যে ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি অনৈতিকতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আধুনিক অর্থনীতি যে জীবন-দর্শনের ওপর ভিত্তি করে বিকশিত হচ্ছে তা টেকসই নয় এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আবার মানবিক এবং জাগতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও সহায়ক নয়। পুজিঁবাদে ব্যক্তিস্বার্থকে সমাজের সঠিক চালিকাশক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। মানুষ যতবেশি আত্ন ও গোষ্ঠী স্বার্থের তাড়নায় প্রতিযোগী হবে, তত বেশি উৎপাদন বাড়াবে, পণ্য বাড়াবে, প্রবৃদ্ধি বাড়াবে ততই বেশি মানুষের জীবনমান উন্নত হবে, মানুষের সম্পদ বাড়বে, মানুষ সুখে এবং শান্তিতে থাকবে। এক কথায় মানুষকে স্বার্থপর হতে হবে। ঝবষভ রহঃবৎবংঃ রং ঃযব নবংঃ রহঃবৎবংঃ. এক্ষেত্রে স্বার্থই পরম সত্য। আসলে কি তাই? মানব জাতি কি সুখে শান্তিতে আছে? তাহলে কেন সমাজ ব্যবস্থার সবর্ত্র অশান্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে? পুজিঁবাদ কি সত্যিকার অর্থে সর্বস্তরের মানুষকে শান্তি দিতে সক্ষম হয়েছে?? অনেকটা প্রাকৃতিক রাজ্যের নিয়মকে ‘ংঁৎারাধষ ড়ভ ঃযব ভরঃঃবংঃ’ কে সামাজিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করে নেওয়া। বিশ্বব্যাপী আজকের মানব সমাজ এই নীতির ওপর ভিত্তি করে চলছে। অর্থনীতি মানবমুখী না হয়ে বাজারমুখী হয়েছে। রাজিৈতক ব্যবস্থাও সেই ধারায় প্রবাহমান।

উধৎরিহ-এর মতে ‘রহ ঃযব ংঃধঃব ড়ভ ঘধঃঁৎব’ অর্থাৎ প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রাণী জগতের ক্রমবিকাশ হয়েছে বিবর্তনের প্রকিয়া ‘ঘধঃঁৎধষ ংবষবপঃরড়হ’-এর মাধ্যমে। এই তত্ত্বকে অনেকে আবার বিবর্তন এর পরিবর্তে রুপান্তর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ঘধঃঁৎব ভধাড়ঁৎং ঃযব ংঃৎড়হমবংঃ মানুষও কি ইতুর প্রাণীর স্তরে নেমে গিয়ে, যে শক্তিশালী শুধু সেই টিকে থাকার নীতিতেই সমাজ পরিচালনা করবে? ইতুর প্রাণীও ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে, কিন্তু মানব সমাজতো তাও মানতে নারাজ। যুগে যুগে মানব সভ্যতার উত্থান ও পতন হয়েছে। মানুষ যখনই নৈতিকতা হারিয়ে শুধু আত্নতুষ্টির প্রতিযোগীতায় ধাবিত হয়েছে তখনই সেই সভ্যতার পতন হয়েছে। শুধু শক্তির জোরে গ্রিক, রোমান, মিসরীয়, চীন, ভারত, ইনকা, মায়াসহ অন্যান্য কোন সভ্যতাই টিকে থাকতে পারেনি। পশু শক্তির জোরে চূড়ান্ত মানবিক বিকাশ সম্ভব নয়। অতীতে মানব সভ্যতার বিকাশ হয়েছে আঞ্চলিক ভিত্তিতে। বর্তমানে একই সভ্যতার বিকাশ বিশ্বব্যাপী। অতীতে সভ্যতার পতন হয়েছে একটা অঞ্চলজুড়ে। পারমানবিক বোমার ভান্ডার থাকার কারণে এখন পতন এলে তা হবে সম্পূর্ণ পৃথিবীজুড়ে।
পুঁিজবাদের আদর্শে আধুনিক প্রযুক্তি ও অর্থনীতি পণ্যের বাজার বিস্তারে ব্যস্ত। গুণগত মান যাচাই না করে প্রচার মাধ্যমে মানুষকে অবিরাম প্ররোচিত করা হচ্ছে নিত্যনতুন পণ্যসামগ্রী কেনার তাগিদ দিয়ে। কিন্তু সেই অনুযায়ী পরিবেশ ও স্বাস্থ্য বান্ধব পণ্যসামগ্রী যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, তেমনি মানুষের ক্রয় ক্ষমতা সবার সমানুপাতিক হারে না বাড়ার কারণে সৃষ্টি হচ্ছে সামাজিক দ্বন্দ্ব ও টেনশন। পৃথিবীর প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র ও অতিদারিদ্রের মধ্য দিয়ে জীবন কাটায়। বাকী অর্ধেকের একটি ক্ষুদ্র অংশ প্রাচূর্য ও বিলাসিতার মধ্যে বাস করে, বাদবাকি মধ্যবিত্ত জীবনযাপন করে। সম্পদের অনৈতিক ও অসম বণ্টন ব্যবস্থার কারণে সামাজিক বৈষম্য জ্যামেতিক হারে বাড়ছে। সুস্থ জীবনধারণের জন্য মৌলিক প্রাকৃতিক উপাদান যেমন জলবায়ু দুষিত ও দুষ্পাপ্য হচ্ছে মানুষের কর্মক্রিয়ার কারণে। লাগামহীন ভোগবাদী পুঁজিবাদ যার নবযাত্রা শুরু হয় জবমধহ ঞযধঃপযবৎ যুগের জবমধহড়সরপং দিয়ে যা এখনো চলমান।
তবে ২০০৮-৯ সালে শুরু হওয়া বিশ্ব মন্দার ধাক্কায় কিছুটা হলেও হুঁশ হয়েছে যে ভৎবব সধৎশবঃ বা মুক্তবাজারের নামে অর্থনীতিতে স্বেচ্ছাচারিতা চলতে দেওয়া যায় না।

১৯২৯ সালের এৎবধঃ উবঢ়ৎবংংরড়হ বা বিশ্ব মন্দায় অফধস ঝসরঃয চিন্তাধারার ঈধঢ়রঃধষরংস বা পুঁজিবাদ ভীষণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হলো। এর প্রেক্ষাপটে এলো ভিন্ন চিন্তাধারার পুঁজিবাদ। যার প্রবর্তক হলেন খড়ৎফ কবুহবং । শুরু হলো কবুবংরধহ বপড়হড়সরপং- এর। পুঁজিবাদকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে অবস্থা বিশেষে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজনে। সরকার বাজারের নিয়ন্ত্রক না হলেও বাজারের প্রহরী। এই চিন্তাধারার সূত্র ধরে উদয় হয় ডবষভধৎব ঊপড়হড়সরপং -এর, জন্ম হয় ঝড়পরধষ ফবসড়পৎধপ -এর। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে প্রতিষ্ঠিতি হয় ডবষভধৎব ঝঃধঃব। আশির দশকে যুক্তরাষ্ট্রে রোনাল্ড রিগান ও যুক্তরাজ্যে মার্গারেট থ্যাচার ক্ষমতায় আসীন হয়ে বা জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের নীতি থেকে সরে গিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রবর্তন করলেন ভৎবব সধৎশবঃ। ২০০৯ সালের বিশ্ব মন্দা আবারও প্রমাণ করল মার্কেট তার নিজস্ব গতিতে সকল সময় সচল ও সুস্থ থাকে না। পুঁজিবাদ মানুষকে স্বার্থপর ও প্রতিযোগী হতে উদ্বুদ্ধ করে। যারা স্বার্থপর হবে না তারা প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে পারবে না। যে যত বেশি আত্নকেন্দ্রিক ও উচ্চাভিলাষী হবে সে তত বেশি সফলকাম হবে। আমরা আমাদের জৈবিক বাসনা পরিতৃপ্ত করার প্রয়াসে সব নৈতিকতা ও মানবতা বিসর্জন দিয়েছি। আমরা নিজেরাই বাজারে পণ্য ক্রয় করতে গিয়ে বাজারের পণ্য হয়ে গেছি। নারী অধিকারের কথা বলে তাদেরকে এমন পেশায় সম্পৃক্ত করা হচ্ছে সেখানে অভিজাত শ্রেণির উৎপাদিত পণ্যের প্রচার করতে গিয়ে নারী নিজেই বাজারে অন্যের পণ্য হয়ে গেছে। বাজারে নান্দুনিকতার নামে অনৈতিকতাকে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে।

কিন্তু মানব সমাজতো আসলে জাবর-কাটা জীব নয়। আমরা একমাত্র সচেতন জীব যা এই পৃথিবী নামক গ্রহের “আশরাফুল মাখলুকাত”সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। আমাদের সমাজ জীবন ‘ংঁৎারাধষ ড়ভ ঃযব ভরঃঃবংঃ’-এর নীতিতে চললে পশু জীবনের সঙ্গে মানবজীবনের পার্থক্যটা থাকল কোথায়? সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবের অর্থনীতির যাত্রা হবে ইনসাফ ভিত্তিক। আমাদের অর্থনীতি হওয়া উচিত ইনসাফ এর মাপকাঠির ভিত্তিতে, অর্থ আয়ের মাপকাঠিতে নয়। গ্রামের বেশিরভাগ লোক গরিব হলেও তারা বিশুদ্ধ বাতাস সেবন করছে। আর সচ্ছল যারা তারা মহানগরীতে বাস করে দুষিত বাতাস সেবন করতে বাধ্য হচ্ছে। টাকার অংকে বাতাসের মূল্য যদি ধরা হয় তাহলে গ্রামের লোকের আয় শহরের লোকের চেয়ে অনেক বেশি হয়। যে সব অঞ্চলে মুক্ত আকাশ, মুক্ত বাতাস ও প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য পর্যটকরা হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে বেড়াতে যায় সেই সব স্থানের বাসিন্দারা প্রতিদিন তা বিনামূল্যে উপভোগ করে। এই সুযোগের আর্থিক মূল্যায়ন কী হবে? মূল্যায়ন না করলেও তার যে একটা প্রকৃত মূল্যায়ন আছে তা কী অস্বীকার করা যাবে? শুধু টাকার মাপে সব কিছুর মূল্যায়ন করার প্রবৃত্তি আমাদের মনোজগতে চেপে বসেছে। এই কালচার বা হীণ মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
ভূটান এমন এশটি দেশ যেখানে অর্থ আয়ের চেয়ে প্রকৃত আয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ.উ.চ. (এৎড়ংং উড়সবংঃরপ চৎড়ফঁপঃ) এর প্রবৃদ্ধি দিয়ে নয় উ.ঐ. (এৎড়ংং উড়সবংঃরপ ঐধঢ়ঢ়রহবংং)-এর মাপদন্ড দিয়ে জীবনের মান নির্ণয় করা হয়। চবৎ ঈধঢ়রঃধ রহপড়সব-এর চেয়ে চবৎ ঈধঢ়রঃধ যধঢ়ঢ়রহবংং বেশি কাম। যদি অবাধ ঞড়ঁৎরংস-এর সুযোগ দেওয়া হতো তাহলে দেশটি আর্থিক মানদন্ডে অনেক বেশি বিত্তশালী হতে পারতো। অতি মাত্রায় পর্যটক ভিড় জমালে প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ বিশেষ করে তাদের সামাজিক ঐতিহ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় ভূটান সরকার প্রতি বছর সীমিত সংখ্যক লোককে পর্যটনের ভিসা দেয়। টাকার গরিমার চেয়ে সুখ, শান্তিময় পরিবেশ এবং তাদের ঐতিহ্য, তাদের কাছে বেশি কাম্য। আজকের দূষিত জলবায়ু ও দূর্নীতি পরারন মানুষের পৃথিবীতে ভূটান একটি ব্যতিক্রমধর্মী শান্তি, সুখ, সুশাসন ও ঐতিহ্যের আদর্শিক দেশ। আমরা প্রকৃত আয়ের (জবধষ রহপড়সব) চেয়ে অর্থ আয়ে (গড়হবু রহপড়সব) বেশি আগ্রহী। গড়হবু সধৎশবঃ এখন নিয়ন্ত্রণ করে ঢ়ৎড়ফঁপঃরাব সধৎশবঃ কে। তাই সব কিছু হয়ে পড়েছে অর্থ নির্ভর। যাদের হাতে যত টাকা তাদের তত প্রতাপ। অর্থ আয়ের ক্ষেত্রে সুদকে মূখ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাজারে অর্থ ব্যবস্থানার ক্ষেত্রে সুদ যাতে মূখ্য ভূমিকা পালন করতে না পারে সে জন্যই হয়তো ইসলামে সুদ নিষেধ করা হয়েছে। বাজারে গড়হবু সবফরঁস ড়ভ বীপযধহমব বিদ্যমান থাকার ফলে সবফরঁস ড়ভ বীপযধহমব স্থিতিশীলতা হারিয়ে অর্থনৈতিক সংকটের সৃষ্টি করে। রাজনীতিও টাকা নির্ভর। কোটি কোটি ব্যয় না করলে সংসদ সদস্য হওয়ার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়া কঠিন। আমেরিকায় মিলিয়ন ডলার না হলে সিনেটর হওয়ার প্রতিযোগিতায় যাওয়া যায় না। বিশেষ করে স্বল্প উন্নত দেশের রাজনীতি দূর্নীতি গ্রস্ত হওয়ার ফলে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সকল স্তরে দূর্নীতি বিদ্যমান। ফলে আইনের শাসন ও সুশাসন প্রশ্নবিদ্ধ। সব ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে গড়হবু ঃধষশং, সড়হবু রিহং। উন্নয়নের অভিযাত্রায় আমরা দ্রুত প্রাকৃতিক সম্পদ নিঃশেষ করে ফেলেছি, পরিবেশ বিষাক্ত করছি, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছি, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনছি। বর্তমানের সুখ ও প্রাচুর্যের জন্য ভবিষ্যতের সুখ ও শান্তি জলাঞ্জলি দিচ্ছি, বিপন্ন করে তুলেছি ভবিষ্যৎ জীবন। অতি অর্থ আয়ের লোভে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার বিষয়টি ভূলেগেছি।
বিশ্বব্যাপী স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা করতে হলে চাহিদার হার অর্থাৎ জধঃব ধহফ ৎধহমব ড়ভ পড়হংঁসঢ়ঃরড়হ কমাতে হবে এবং অর্থের লোভে প্রভাবিত জীবনধারা ষরভব ংঃুষব বদলাতে হবে যা প্রচলিত রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মেনে নেওয়া বেশ কঠিন। সুদূর ভবিষ্যতের কথা বাদ দিলেও বলতে হয় রাজনীতিবিদরা ২০ বছর পর কী হবে সেই চিন্তা করে রাজনীতি করেন না। তারা কোন সুযোগে ক্ষমতায় যাবেন এবং কি করে ক্ষমতায় বহাল থাকবেন সেই চিন্তা ও কৌশল নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। ইতিহাসে রাষ্ট্র নায়কসহ রাজনীতিবিদদের করুণ পরিণতির কাহিনী জানা সত্ত্বেও ইতিহাসের শিক্ষা নিয়ে বিশ্বব্যাপী দেশ (স্বল্প উন্নত দেশ সমূহ) গড়ার কাজে আত্ননিয়োগ করতে তাঁরা ইচ্ছুক নন।
বিশ্বায়নের সমাজ ব্যবস্থা টেকসই করার স্বার্থে চাহিদার আগুন প্রশমিত করে মৌলিক প্রয়োজন যেমন-খাদ্য, বাসস্থান,সুশিক্ষা, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ জীবন পূরণের অর্থনীতি ও রাজনীতি করা অপরিহার্য। গতানুগতিক রাজনীতি ও অর্থনীতি দিয়ে সে আশা পূরণ সম্ভব নয়। সেই জন্য প্রয়োজন হবে চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন। প্রয়োজন হবে বলিষ্ঠ নেতৃত্বের। সত্যিকারের নেতা সেই যে মানুষকে পরিচালনা করে, মানুষ কর্তৃক পরিচালিত হয় না। খবধফবৎ এবং চড়ষরঃরপরধহ-দের মধ্যে পার্থক্য এখানেই। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, উপমহাদেশে মহন দাশ করম চাদ মহাত্না গান্ধী, কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলেন খবধফবৎ আর বাকীরা হলেন চড়ষরঃরপরধহ। আমেরিকায় যেমন আবরাহাম লিঙ্কন হলেন খবধফবৎ আর রিচার্ড নিক্সন হলেন চড়ষরঃরপরধহ। বিশ্বব্যাপী চলমান বাস্তব রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে বলা যায়, বর্তমানে রাজনীতি এক আকর্ষণীয় পেশা-মানব সেবায় নিবেদিত কোনো সাধনা নয়। ইতিহাস সাক্ষী-নৈতিকতা ও মানবিকতা বিবর্জিত জ্ঞান-বিজ্ঞান ও রাজনীতি কখনো মানুষের মঙ্গল নিশ্চিত করতে পারে না।

সবার জন্য মৌলিক চাহিদাসহ সর্বাধিক কল্যাণ পূরণের পরিপন্থী আধুনিক উত্তর জীবনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তাচেতনা, ধ্যান-ধারণা ও জীবনধারার কারণে যে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছে আগামীতে তার ভয়াবহতা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও রাজনীতি ও অর্থনীতিতে যে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন তা নিয়ে কোনো জোড়ালো কথাবার্তা দেখা যাচ্ছে না। শুধু কার্বন নির্গমন রোধ করার আলোচনা নিয়ে গড়িমশি ও শেষ পর্যায়ে প্রায় ভেস্তে যাওয়া কোপেনহেগেনে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত মহাসমাবেশ একটা জোড়াতালির অঙ্গীকারে পরিণত হয়েছে। পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ইতিমধ্যে প্যারিস শীর্ষ সম্মেলনে হাঁক-ডাক করে অনেক কথাবার্তা হয়েও শেষ পর্যন্ত এখনো কিছু হয়নি। বিশ্বখ্যাত পরিবেশ বিজ্ঞানী জেইমস হেনসেন-এর মন্তব্য হলো-‘একগাদা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি’। যাকে বলা যায় ভধপব ংধারহম সমাধান। নব্য নির্বাচিত কান্ডজ্ঞানহীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবিবেচক এর মতো ঘোষণা দেন যে তিনি প্যারিস সম্মেলনের সমঝোতা চুক্তি মানবেন না। তার এই ঘোষণা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে। কেননা তিন মনে করেন অতিমাত্রায় কার্বন নির্গমনের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়ে বিজ্ঞানী ও গবেষকরা যে সব কথাবার্তা বলেছেন ও সতর্ক করছেন তা সবই ভুয়া। যে ব্যক্তি জেগে ঘুমায় তাকে জাগানো যায় না। এই যখন বিশ্ব পরিস্থিতি তখন মানব সৃষ্ট প্রলয় থেকে বঁচার উপায় কী? তার উত্তর খোজে পাওয়া যায় না। এই অবস্থায় মানবিক অধিকার বলতে কে কী বুঝে জানি না। সাধারণভাবে আমরা বলতে পারি সবার বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদান অন্ন, বস্ত্র,বাসস্থান, সুস্বাস্থ্য, সুশিক্ষা ও নিরাপত্তা মানবিক। এগুলো অধিকার পূরণের পূর্বশর্ত। বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে মৌলিক উপাদানের সাথে সংযুক্ত হয়েছে বিশুদ্ধ জলবায়ুর নিশ্চয়তা। প্রকৃতির প্রত্যাশা অগ্রাহ্য করে আত্নকেন্দ্রিক জীবনধারায় গা ভাসিয়ে দিলে যখন তখন প্রকৃতির প্রতিশোধ নেবার পালা আসলে তা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে না। মানুষ ভূল করলেও নিয়তি ভূল করে না। কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে বিক্ষোভকারী মিছিলের প্রধান দাবী ছিল যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জলবায়ু দুষিত হচ্ছে তা রোধ করা সম্ভব না হলে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা যাবে না। কবে সেই কাঙ্কিত পরিবর্তন আসবে এই মুহুর্তে তা বলা মুশকিল।
বিশ্বায়নের প্রভাবে প্রভাবিত সমাজ ব্যবস্থার আলোকে বলা যায় মানব সৃষ্ট বিধি বা পদ্ধতি পরিবর্তন হলেই যে সব সমস্যার সমাধান হবে তা ঠিক নয়। ইতিহাস বলে-আর্থ-সামাজিক অবস্থা যাই হোক, যে সমাজে নৈতিকতা ও মানবিকতার কোনো দাম নেই, দাম আছে শুধু প্রযুক্তি ও পণ্যের, ক্ষমতা ও সম্পদের সেই সমাজ বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না। আমরা জানি কমিউনিস্ট পার্টির চরম দূর্নীতি, মানবিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ধ্বংশ করার কাজে অধিক মানসিক শক্তি ব্যয় করার কারণে এবং সমাজতন্ত্রের দুর্বলতার কারণ গুলো সোভিয়েত রাশিয়ার ভাঙনের মূলে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। এই ব্যর্থতা থেকেই শিক্ষা নিয়ে রাশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট তার রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্বের নীতি থেকে সরে এসে সময়োপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে নতুন রুপে নতুন আঙ্গিকে বিশ্বব্যাপী পরাশক্তির ভূমিকা পালন করছে। মহাহগ্রন্থ আল কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-আমরা মাটি খুঁড়লেই দেখতে পার কত শত জনপদ ও সভ্যতা নৈতিকতা ও মানবিকতার স্থলনে ধ্বংস হয়ে মাটিচাপা পড়ে আছে। নৈতিকতা ও মানবতা বোধের চরম অবনতি যখন ঘটে মহান সৃষ্টি কর্তা তখন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মাধ্যমে সেই সমাজকে ধ্বংস করে দেন। বর্তমানে পৃথিবীতে যত গুলো মরুভূমি বিদ্যমান আছে সে গুলো তার সাক্ষী হয়ে আছে।
আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ আর অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা এই দুইয়ের প্রভাবে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে ধসে পড়বে আধুনিক সভ্যতা। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার অর্থায়নে পরিচালিত এক গবেষণা শেষে এমন ভবিষ্যত বাণীই করেছেন বিজ্ঞানীরা। একটি তাত্ত্বিক কাঠামোর ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা গবেষণাটি করেন। বর্তমান সভ্যতার পতন হওয়ার আগেই সমাজের অভিজাতদের ‘যেমন চলছে চলুক’ নীতির ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের অভিজাতরা যদি এখনই অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়, তাহলে সভ্যতার এই সম্ভাব্য ধ্বংস এড়ানো যেতে পারে। বিজ্ঞানী আইনস্টাইনও রাজনীতি সম্পর্কে ভবিষ্যত বাণী করতে গিয়ে বলেছিলেন চতুর্থ বিশ্ব যুদ্ধ হবে দা-কুড়াল আর বল্লম দিয়ে। এতে প্রমাণিত হয় আধুনিক ও আধুনিক উত্তর সভ্যতা মানব সৃষ্ট দানবের কারণে ধ্বংস হবে। আর এই ধ্বংস যজ্ঞে সর্ব প্রথম বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে অভিজাত শ্রেণি। সমাজ বিজ্ঞানী প্যারোটো বলেছেন সমাজ ব্যবস্থা ও ক্ষমতার পালা বদলে সর্ব প্রথম অভিজাত শ্রেণির স্বার্থ ক্ষুন্ন হয় যদিও তদস্থলে নতুন অভিজাত শ্রেণির আগমন ঘটে। তবে বিশ্বায়নের সভ্যতা ধ্বংস হওয়ার সাথে সাথে অর্থ আয়ের সকল পন্থা ও সুযোগ-সুবিধার পথও ধ্বংস হবে। বর্তমানের মতো ফিরে আসার বা আবির্ভাবের সুযোগ থাকবে না। বিধায় শাসক শ্রেণিসহ অভিজাত তথা এলিট শ্রেণিকে নৈতিকতা ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বর্তমান সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সর্বাত্বক চেষ্টা চালাতে হবে।
জার্মান দার্শনিক ঋৎরফৎরপয ঐবমবষ ও আরব দার্শনিক ইবনে খালেদুনের চিন্তাধারা অনুযায়ী ইতিহাসের গতিধারা পরিচালিত হয় আদর্শিক দ্বন্দ্বের প্রক্রিয়ায়। আর জার্মান দার্শনিক ঈধৎষ গধৎী-এর তথ্য অনুযায়ী ইতিহাস রচিত হয় সমাজে শ্রেণি দ্বন্দ্বের প্রক্রিয়ায়। ঐবমবষ ও খালেদুনের দষ্টিভঙ্গি হলো ওফবধষরংঃরপ আর গধৎী-এর দৃষ্টিভঙ্গি হলো গধঃবৎরধষরংঃরপ।
যে দৃষ্টিতেই আমরা ইতিহাসকে দেখি না কেন, এটা ধ্রুব্য সত্য যে নৈতিকতা ও মানবিকতা মানব সমাজের এই দুই স্তম্ভ ব্যতিরেকে মানব সভ্যতা বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না।

বিশ্বায়নের মানুষ মনে করে আমাদের সেবায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং আইনের শাসন আছে যতদিন, ততদিন আমাদের এই কালের অগ্রযাত্রা কোনো কিছুই রোধ করতে পারেেব না। শুধু প্রযুক্তি প্রাপ্ত নিত্যনতুন উদ্ভাবন ও উপকরণ এবং মানব তৈরি আইনের শাসন দিয়ে মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখা যাে না যদি বিবেকের অনুশাসন ও মানবিকতার ¯িœগ্ধ ধারা সেখানে না থাকে। বিবেকহীন জীবন লাগামহীন জীবন। মানবিকতাশূণ্য জীবন অন্তঃসারশূণ্য জীবন। না ¯্রষ্টা না বিবেক আমরা যদি কোনোটাই না মানি, আমরা যদি শুধু বুদ্ধিচালিত ও রিপু তাড়িত ঐবফড়হরংঃরপ জীবনধারায় গা ভাসিয়ে দেই তাহলে আজকের সভ্যতা ভেঙ্গে পড়তে বেশি সময় লাগবে না।
মহান সৃষ্টি কর্তা অত্যন্ত নান্দুনিকতার মাধ্যমে বিশ্বভূমন্ডল এবং প্রাকৃতিক স¤্রাজ্য সৃষ্টি করেছেন। আর তার এই সৃষ্টি জগতের সর্ব শ্রেষ্ঠ জীব হচ্ছে মানুষ। বিধায় সৃষ্টি জগতের নান্দুনিক প্রাকৃতিক স¤্রাজ্যকে ধ্বংস করার কোনো নৈতিক অধিকার মানুষের নেই। মানুষের মনোজগতে যদি সকল সময় মহান সৃষ্টি কর্তার উপস্থিতি স্মরণ রাখা যায় তাহলে মানুষের বিবেকবোধ সুপ্রবৃত্তি দ্বারা পরিচালিত হতে বাধ্য। প্রাচুর্যের লালসাই মানুষকে কুপ্রবৃত্তির দিকে ধাবিত করে। বিবেকবোধের মধ্যে যখন নীতিবোধের অর্থাৎ নৈতিকতা ও মানবিকতার প্রভাব পরিলক্ষিত হবে তখন প্রাচুর্যের লালসা হ্রাস পেতে বাধ্য হয়। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে মহান সৃষ্টি কর্তা বলেন-যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারাই সৃষ্টির সেরা। বর্তমান সভ্যতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে বিশ্বায়নের প্রভাবে ঢালাওভাবে প্রভাবিত না হয়ে বিশ্বব্যাপী নৈতিকতা ও মানবিকতার চর্চার মাধমে সৃষ্টির সেরা হওয়ার যোগ্যতা প্রমাণ করা অপরিহার্য। যেহেতু পৃথিবীতে প্রতিটি ধর্মের আগমন ঘটেছে অধর্মকে বিনাশ করার জন্য সেহেতু সৃষ্টির সেরা হিসেবে সৎকর্মের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ঠ সকলকে সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার প্রতিযোগীতায় অবতীর্ণ হওয়া আবশ্যক।