মাত্র একটি পরিবারই রক্তে ভাসালো গোটা শ্রীলঙ্কা

52
সংগৃহীত ছবিতে জাহারান হাশিম, যাকে হামলার মাস্টারমাইন্ড বলা হচ্ছে 

:: ডেস্ক রিপোর্ট. MB TV :: ইস্টার সানডের প্রার্থনাকে কেন্দ্র করে শ্রীলঙ্কায় বর্বরোচিত বোমা হামলার ঘটনায় এক হামলাকারীর কাঁধে ভারী ব্যাগ বয়ে নিয়ে গির্জায় প্রবেশ এবং পরমুহূর্তেই বিস্ফোরণে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সেই গির্জায় নিহতের সংখ্যা ৬৭। এই হত্যাযজ্ঞে এক মুসলিম দম্পতির সংশ্লিষ্টতার খবর বেরিয়ে এসেছে যাতে দাবি করা হচ্ছে যে মাত্র একটি পরিবারই রক্তে ভাসালো গোটা শ্রীলঙ্কা।

ছবির এই চরমপন্থী নিগোম্বোর সেইন্ট সেবাস্টিয়ান গির্জায় হামলা চালান। এ ভয়ংকর ঘটনা ঘটানোর আগে হামলাকারী গির্জার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক শিশুর মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। গির্জায় তার প্রবেশের পর পরই একটা ধোঁয়াটে আলোর ঝলকানিতে বিস্ফোরণ ঘটে। চারদিকে ছুটে ধাতব স্প্লিন্টার, পথে যা ছিল সব শেষ করে দিয়ে যায়।

সংগৃহীত ছবিতে বোমাসহ ব্যাগ কাঁধে গির্জায় প্রবেশরত হামলাকারী

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দিলীপ ফার্নান্দো বলেন, আমার পরিবার এক তরুণকে ভারী ব্যাগ নিয়ে গির্জায় প্রবেশ করতে দেখেন। সে আমার নাতনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। এটাই ছিল হামলাকারী।

এ হামলা এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৩৫৯-এ ঠেকেছে। শিশুর সংখ্যা ৪৫। যা থেকে পরে গণনায় ভুল হয় বলে ১০৬ জন কমে ২৫৩ তে এসে দাঁড়ায়। এ ঘটনায় সাতটি শক্তিশালী গ্যাং জড়িয়ে রয়েছে যার মধ্যে আছেন ইলহাম ইব্রাহিম, তার স্ত্রী ফাতিমা এবং তার ভাই ইনশাফ। এই মানুষটি এসেছেন এক ধনী পরিবার থেকে। তাদের বাড়িতে পুলিশ গেলে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ফাতিমা তার তিন শিশুসহ নিজেকে বোমায় উড়িয়ে দেন। ৩৬ বছর বয়সী ইলহামের টার্গেট ছিল শানগ্রি লা হোটেল। সেখানে ব্রিটিশ নাগরিক বেন নিকোলসন তার স্ত্রী অ্যানিটা (৪২), পুত্র অ্যালেক্স (১৪) এবং কন্যা অ্যানাবেল (১১)-কে হারিয়েছেন।

এই হামলাকারীর ছবি প্রকাশ করেছে জঙ্গী সংগঠন ইসলামিক স্টেট। গতকাল এ হামলার জন্যে তাকেই দায়ী করা হচ্ছে। তার মাথায় বালাক্লাভা টুপি ছিল।

এই বোমা হামলার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে উঠে আসছে মৌলভি জাহরান হাশিম। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি দ্বিতীয় বোমার বিস্ফোরণ ঘটান যার বিস্ফোরণে ব্রিটিশ ভাই-বোন ডেনিয়েল লিনসে এবং অ্যামেলি নিহত হন।

পুলিশ কলোম্বোর ডেমাটাগোডায় ইব্রাহিমের বাড়িতে তল্লাশি চালায়। সেখানে তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ফাতিমা আত্মঘাতী ভেস্ট পরেছিলেন। তিনটি সন্তানও রয়েছে তার। আত্মঘাতী বিস্ফোরণে তিন সন্তানসহ ফাতিমা এবং একজন ইন্সপেক্টর ও দুজন কনস্টেবল নিহত হয়েছেন। তার স্বামীর ৩৮ বছর বয়সী ভাই ইনশাফ টার্গেট করেন সিনামোন গ্র্যান্ড হোটেল, জানায় পুলিশ। কলোম্বোতে তার একটি তামার কারখানা ছিল, যান মা কোলোসাল স্টিল। পুলিশের বিশ্বাস, বোমা বানানোর কাজটি এখানেই ঘটে। ওই কারখানা থেকেই বোমার জন্যে বোল্ট এবং স্ক্রু দেয়া হয়। এই কারখানা থেকে ম্যানেজারসহ ৯ জন শ্রীলঙ্কানকে আটক করা হয়েছে।

ওই কারখানায় কর্মীদের ঘুমানোর ব্যবস্থা ছিল। সেখানে একটি শয়নকক্ষে ছিল ১৫টি বিছান। সেখানে থাকেন ২৩ জন ভারতীয় এবং ১১ জন বাংলাদেশি। এরা কেউ এমন হামলার বিষয়ে কিছুই জানতেন না।

সংগৃহীত ছবিতে ‘কোলোসাল স্টিল’ যেখানে বোমা বানানো হয়েছে ধারণা স্থানীয় পুলিশের

হামলার নেপথ্যে থাকা দুই ভাই ছিলেন ধনী। তারা বিলাসী জীবনযাপন করতেন। এমন কর্মকাণ্ড তাদের স্বজন ও বন্ধুদের মানসিক আঘাত দিয়েছে। ইনশাফ বার স্ত্রী ও চার সন্তানকে নিয়ে প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি টকা মূল্যের ম্যানশনে বাস করতেন। তার মেয়েটির বয়স ৮ বছর। তিন ছেলের বয়স ৬, ৪ এবং ২ বছর। তার শ্যালক আশখান আলাওদিন অলংকারের ব্যবসা করেন। শ্যালক জানান, আমি পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে পড়েছি। আমার বোনের স্বামী (ইনশাফ) ব্যবসার কাজে শুক্রবার জাম্বিয়া যান। বিমানবন্দরে আমার বোন এবং চার সন্তানকে নিয়ে যান। যখন তারা সবাই বিদায় জানায় তিনি বলেছিলেন ‘শক্ত থাকো’। বিদায়ের মুহূর্তে এ কথা একটু অন্যরকম ঠেকলেও বিশেষ কোনো ইঙ্গিত বহন করে না। তিনি চলে যাওয়ার পর আমরা সবাই কলোম্বোর বাইরে আমাদের বাবার বাড়িতে চলে যাই। সেখানে আমরা সবাই ছুটির আমেজে ছিলাম। আমার বোন একেবারে ভেঙে পড়েছেন। আমাদের পরিবারে এমন কিছু ঘটবে তা আশা করিনি। যে ঘটনা ঘটেছে তার সামান্য ইঙ্গিত পেলেও আমি সোজা পুলিশের কাছে যেতাম, জানান আশখান।

‘আমার বোনের স্বামী একটা মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষ। দোজখের শাস্তি তার জন্যে কাঙ্ক্ষিত বিষয়’, বলেন শ্যালক।

ইনশাফের সব ল্যাপটপ এবং সিসিটিভি জব্দ করেছে পুলিশ। তার ভাইয়া ইলহামের বাড়িতে ডগ স্কোয়াড নিয়ে তল্লাশি চালিয়েছে। বাড়ির বাইরে ধুলো জমে থাকা একটি সাদা বিএমডাব্লিউ গাড়ি পরখ করা হচ্ছে আঙুলের ছাপের জন্যে।

ফাতিমার আত্মঘাতী বোমায় বাড়ির নিচতলার জানালাগুলো ভেঙে গেছে। প্রতিবেশী পাকির নজর এবং তার ভাতিজী সাজিথি ফকির জানান, বিস্ফোরণে তাদের বাড়িও কেঁপে ওঠে। স্থানীয়রা জানান, এই দুই ভাইয়ের বাবা মিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী ছিলেন।

পাকির আরো বলেন, ইব্রাহিমের পরিবার বেশ বড়। তারা ৮ ভাই এবং ৩ বোন। তাদের বাবা একজন মসলার ডিলার ছিলেন এবং এই অঞ্চলে বেশ পরিচিত ছিলেন। এ ঘটনার পর এখানকার মুসলমানদের শান্তি নষ্ট হয়ে গেলো।

দুই সন্তানের জননী সাজিথি জানান, এ ঘটনার পর তাদের স্বামীকে আটক করা হয়েছে। দ্বিতীয় বোমা বিস্ফোরণের পর আমার স্বামী বাইরে যান কি হয়েছে দেখার জন্যে। সেখানেই তাকে আটক করা হয়।

সংগৃহীত ছবিতে হামলায় জড়িত সন্দেহভাজন আট , একমাত্র মাঝখানে জাহরানের মুখ খোলা

গত মার্চের ১৫ তারিখে নিউ জিল্যান্ডে এক শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীর মসজিদে হামলায় অর্ধশত মুসলমান প্রাণ হারান। ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কার ঘটনার পর ব্রিটিশ কাউন্টার টেরর এমআই৫ ব্রিটেনের ঝুঁকিপূর্ণ দিকগুলো খতিয়ে দেখছে।

এক কর্মকর্তা জানান, মনে হচ্ছে এ হামলা আইএস সমর্থিত। যুদ্ধে পরাজিত আইএস সেনারা যার যার দেশে ফিরছে। তারাই হয়তো এমন হামলা ঘটিয়েছে। (দ্যা মিরর অবলম্বনে)