চাকরির আড়ালে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন পপি!

244

:: নিজস্ব প্রতিবেদক :: চাকরিচ্যুত হওয়া অ্যাসিসটেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মনিরা সুলতানা পপির বিরুদ্ধে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবির ঘটনায় মামলা করেছে বেসরকারি খাতের দি সিটি ব্যাংক লিমিটেড কর্তৃপক্ষ। এর আগে ব্যাংকের পাওনা প্রায় ১ কোটি টাকা ফেরত না দেওয়ার জন্য নানা টালবাহানা করেন ওই কর্মকর্তা।

এমনকি ব্যাংকটির তিন প্রধান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মিথ্যে যৌন হয়রানির মামলাও করেছেন বলে সুনিদিষ্ট অভিযোগ রয়েছে চাকরিচ্যুত হওয়া ওই নারীর বিরুদ্ধে।
সূত্র জানায়, সিটি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইনের ব্যক্তিগত সহকারী মনিরা সুলতানা পপির বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা বিরোধী নানা অভিযোগ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছিল। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পে-রোল ব্যাংকিং বিভাগে তাকে বদলি করা হয়। বদলির পর থেকে মনিরা সুলতানা পপি দীর্ঘদিন কর্মস্থলে কোনো ধরনের পূর্ব অনুমতি ছাড়াই অনুপস্থিত ছিলেন। ব্যাংকের নিয়ম ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাকে তিনবার রেজিস্ট্রি ডাকযোগে নোটিস পাঠায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তারপরও তিনি কর্মস্থলে যোগদান না করায় এবং অননুমোদিত অনুপস্থিত থাকায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে অব্যহতি পান। বর্তমানে প্রভিডেন্ট ফান্ড ঋণ, হাউজ বিল্ডিং ঋণ, ক্রেডিট কার্ড ও গাড়ির ঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ খাতে মনিরা সুলতানা পপির কাছে তার চাকরিরত থাকাকালে যাবতীয় প্রাপ্ত টাকা সমন্বয় করার পরও ব্যাংকের প্রায় ১ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এসব ঋণের টাকা পরিশোধ করার জন্য তাকে নোটিসও দেয়।

ব্যাংক সূত্র বলছে, নোটিসের উত্তর তো পপি দেননি। উল্টো সিটি ব্যাংক এবং ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুনাম, সম্মানহানি, ব্ল্যাকমেইল করাসহ ব্যক্তিগত ক্ষোভ চরিতার্থ, অন্যায় ও অবৈধভাবে ৫ কোটি টাকা অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছেন। এরই অংশ হিসেবে সিটি ব্যাংকের এমডি মাশরুর আরেফিন, হেড অব সিএসআরএম আবদুল ওয়াদুদ ও কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ কাফির বিরুদ্ধে গুলশান থানায় যৌন হয়রানির মামলা করে অপপ্রচার চালাচ্ছেন মনিরা সুলতানা পপি। যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এমনকি পপি ব্যাংকের কাছে ইতোমধ্যে ৫ কোটি টাকা পাবেন দাবি করে তার পদে প্রমোশনসহ পুনর্বহালের দাবি জানান। যা সম্পূর্ণ ব্ল্যাকমেইলের শামিল। পপির ৫ কোটির টাকা চাঁদা দাবির ৪৫ মিনিটের ভয়েজ রেকর্ডও ব্যাংকের কাছে রয়েছে বলে জানা গেছে।

একাধিক সূত্রে জানা যায়, সিটি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইনের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় গোপনে অবৈধভাবে ড্রাইভারদের ওপর নিজস্ব প্রভাব খাটিয়ে মোট ২৫০ দিন মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত ব্যাংকের গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন মনিরা সুলতানা পপি। চাকরিরত ড্রাইভারদের বক্তব্য অনুযায়ী, মনিরা সুলতানা পপি মধ্যরাতে বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, পার্লারসহ অন্যান্য স্থানে যেতেন। মধ্যরাতে ওইসব জায়গায় যাওয়ার সময় অপরিচিত লোকজন তার গাড়িতে উঠে বসতো। পপি নিয়মিত নেশা করতেন বলেও তাদের বক্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে।

ব্যাংকের চাকরিরত অবস্থায় আড়ালে নিজের একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন পপি। লেগেসি মেকওভার (বিউটি পার্লার), লেগেসি ইন্টারন্যাশনাল প্রি স্কুল অ্যান্ড ডে-কেয়ার (স্কুল), লেগেসি গ্লোবাল কনসালটেন্সি (এজেন্ট ব্যাংকিং), এনএমসি এন্টারপ্রাইজ (এজেন্ট ব্যাংকিং) নামে তার চারটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা সিটি ব্যাংকের সঙ্গে তার চাকরির শর্তের খেলাপ হয়েছে। তার এইসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ট্রেডলাইসেন্স রয়েছে যা ভোরের পাতার অধিকতর তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।
তার চারটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানাগুলো- (লেগেসি মেকওভার) এইচ-২৭৭, রোড-১৬, ব্লক-কে, দক্ষিণ বনশ্রী, ঢাকা, (লেগেসি ইন্টারন্যাশনাল প্রি স্কুল অ্যান্ড ডে-কেয়ার) এইচ-৭০, রোড-৬, ব্লক-বি, দক্ষিণ বনশ্রী, ঢাকা, (লেগেসি গ্লোবাল কনসালটেন্সি) বনশ্রী, ঢাকা, (এনএমসি এন্টারপ্রাইজ) এইচ-৭০, রোড-৭, ব্লক-বি, দক্ষিণ বনশ্রী, ঢাকা।

এসব ঘটনায় ২০ আগস্ট মনিরা সুলতানা পপির বিরুদ্ধে রাজধানীর গুলশান থানায় একটি মামলা করেছেন সিটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের লিগ্যাল ডিভিশনের হেড অব কোর্ট অপারেশন একেএম আইয়ুব উল্লাহ।

মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা পপি চাকরিতে পুনর্বহালসহ নগদ ৫ কোটি টাকা ও বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার অযোক্তিক দাবি করেছেন। এসব দাবি মেনে নেওয়া না হলে এমডিকে চাকরি করতে দেবেন না এবং নানাভাবে হয়রানি করারও হুমকি দেন। এমনকি এমডির সম্মানহানি করার হুমকিও দিয়েছেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) স ম কাইয়ূম বলেন, সিটি ব্যাংকের অভিযোগ মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে এর তদন্তও শুরু হয়েছে।

এদিকে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াই মনিরা সুলতানা পপির বেশ কিছু অশালীন ছবি ভাইরাল হয়ে গিয়েছে। নেটিজেনরা দাবি করেছে, যে মেয়ে নিজেই অশালীন পোশাক পরে, তার আবার কিসের শ্লীলতাহানি! বিতর্কের সূত্রপাত হয় পপির অশালীন পোশাকের বিভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি দেওয়াকে কেন্দ্র করে, সেখান থেকেই সমালোচনার ঝড় শুরু হয়।